ঢাকা থেকে সিকিম ভ্রমণের যাবতীয় তথ্য
লেখকঃ এডমিন, লার্নিং এন্ড ট্রাভেলিং গ্রুপ
তারিখঃ ০৫ নভেম্বর, ২০২৪
আলহামদুলিল্লাহ্! সিকিম আল্লাহর সৃষ্টি এক অপূর্ব স্থান। খালি চোখে এর আগে বরফের এমন অভূতপূর্ব সৌন্দর্য কখনো দেখা হয়নি। যারা ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য শুরু করছি সিকিম সিরিজ। বাংলাদেশ থেকে কিভাবে অল্প খরচে সিকিম ঘুরতে যাবেন, কোথায় কোথায় ঘুরবেন, কখন গেলে বরফ পাবেন, কোথায় থাকবেন, সব মিলিয়ে কেমন খরচ হবে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করবো সিকিম সিরিজের গল্পগুলোতে।
এই সিরিজের প্রথম লেখায় আলোচনা করবো, আমরা কিভাবে ঢাকা থেকে অল্প খরচে বুড়িমারী বর্ডার হয়ে সিকিম ঘুরতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে কি কি সমস্যা ফেইস করেছি এবং কিভাবে সেগুলো অভারকাম করেছি।
আমরা রওয়ানা দিয়েছিলাম ঢাকা আব্দুল্লাপুর থেকে। এস আর ট্রাভেলস এর নন এসি বাসের টিকেট ৩ দিন আগেই কেটে রেখেছিলাম। ঢাকা থেকে বুড়িমাড়ির টিকেট মূল্য ১২০০ টাকা। বাসের সার্ভিস এক কথায় চমৎকার ছিলো রাত নয়টায় আমাদের বাস ছাড়ার কথা থাকলেও জ্যামের কারণে এক ঘন্টা লেইট হয়। রাত ১ টার দিকে ফ্রেশ হবার জন্য এবং হাল্কা নাস্তার জন্য সিরাজগঞ্জের ফুড ভিলেজে আমাদের ৩০ মিনিটের ব্রেক দেয়। ভুড ভিলেজ রেস্টুরেন্টটি অসাধারণ তবে খাবারের মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি।
যাইহোক, আমাদের গাড়ির ড্রাইভার অসাধারণ ছিলেন। ভোর ৫ টায় আমাদের বুড়িমারি নামিয়ে দেন। বুড়িমাড়ি পৌছে আমাদের প্রথম কাজ ছিলো ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করা। বলে রাখা ভালো, বুড়িমারিতে ইমিগ্রেশনের কাজ শুরু হয় সকাল ৯ টায়। আমরা নিজেরা ঝামেলা নিতে চাইলাম না। যে বাসে আসলাম তাদের পাসপোর্ট এবং জনপ্রতি ৪০০ করে টাকা দিয়ে দিলাম এবং ট্রাভেল ট্যাক্স বাবদ জনপ্রতি ১০০০ টাকা দিলাম।
তারপর সকালে আমরা বুড়ির দোকানে নাস্তা শেষ করে নয়টা বাজার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। ইমিগ্রেশন শুরু হলে, তারাই আমাদের সবকাজ সম্পন্ন করে দিয়েছিলেন। এখানে সব কাজ বলতে দালালরা বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন অফিস থেকে আপনার পাসপোর্টে একটা সিল নিয়ে দিবে এবং আপনার ট্রাভেল ট্যাক্স পরিশোধ করে দিবে এটাই। বাকী কাজ বর্ডার ক্রস করার পর লাইন ধরে আপনাকেই করতে হবে। বিভিন্ন পয়েন্টে চেক হবে, এবং আপনাকে কিছু প্রশ্ন করবে, ব্যাস আপনার ইমিগ্রেশন কমপ্লিট। আলহামদুলিল্লাহ্ কোন ঝামেলা ছাড়াই সকাল ৯.৩০ টার মধ্যে আমরা ইমিগ্রেশন শেষ করে পৌছে যায় ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা অর্থাৎ বর্ডারের একপাশে বুড়িমারী বাংলাদেশ, অপরপাশেই চ্যাংড়াবান্ধা।
আপনাদের একটা ট্রিকস বলি,যেটা সচরাচর কেউ বলেনা। সেটি হলো ইমিগ্রেশন শুরু হলে আপনারা দুটো টিমে ভাগ হয়ে যান। একটা টিম ৮.৩০ টার পরথেকে ইমিগ্রেশনের লাইনে শুরুর দিকে দাড়িয়ে যান এবং অপর টিম দালালদের সাথে থেকে সবার আগে পাসপোর্টগুলো বের করে নিন।
দালালরা কিন্তু অনেক পাসপোর্ট একসাথে জমা দেওয়ার চেষ্টা করবে, এখানে তারা টাইম নিবে। কাজটি মোটেও কঠিন না, কিন্তু বুড়িমারী বর্ডারে যেখানে ইমিগ্রেশন হয়, সকালে সেখানে অনেক চাপ থাকে, নিজে নিজে করতে চাইলে সময় বেশি লাগে! দালালদের পরিচিত থাকে তাই তারা দ্রুত আপনার পাসপোর্টে সিল এবং ট্রাভেল ট্যাক্সের কাগজ এনে দিতে পারে।
তাদের কাছে পাসপোর্ট দেওয়ার আগে তাদের ডিটেইলস জেনে নিবেন। সম্ভব হলে মোবাইল নাম্বার নিয়ে রাখবেন।
ইমিগ্রেশন শেষ করে আমরা মানি একচেঞ্জ করি। বুড়িমারীতে কমপারেটিভলি কম রেইট থাকে। অনেক ঘুরাঘুরি করে আমরা বাংলাদেশের ১০০ টাকায় ৭১.২০ রুপি রেইট পায়। তারপর সেখান থেকে লোকাল অটোভাড়া করে আমরা চলে যায় শিলিগুড়ি বাইপাস। জনপ্রতি ভাড়া পরে মাত্র ৩০ রুপি। শিলিগুড়ি বাইপাস থেকে শিলিগুড়ি লোকাল বাস ধরে ১.৩০ ঘন্টায় চলে যায় শিলিগুড়িতে; দূরত্ব ৮০ কিলোমিটার। ভাড়া জনপ্রতি ৭০ রুপি। দুপুর ১২.৩০ টার মধ্যেই আমরা পৌছে যায় শিলিগুড়ি।
সিকিম ট্যুর সহজ করতে চাইলে শিলিগুড়িতে আপনাকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। কাজ হলো তিনটি- সিম ক্রয়, এজেন্সির সাথে কথা বলা, এবং দ্রুত গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করা।
টিম বা এজেন্সি ছাড়া আপনি সিকিম ঘুরতে পারবেননা। কেননা সিকিমের অধিকাংশ পয়েন্টেই চেকপোস্ট রয়েছে, ঘুরতে গেলে যেগুলো থেকে আপনাকে ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে, যা এজেন্সির মাধ্যমে করা একেবারেই সহজ। এই এজেন্সির সহায়তা আপনি গ্যাংটক পৌছেও নিতে পারেন আবার ট্যুরকে সহজ করতে চাইলে শিলিগুড়ি থেকেও নিতে পারেন। তবে খরচ কিছুটা বেশি পড়বে। চলুন বিস্তারিত জেনে নেই।
শিলিগুড়িতে গিয়ে আমরা প্রথমে সিম ক্রয় করি। তারপর দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। এখানে আমরা একটা ভুল করে বসি। হাতে অনেক সময় আছে ভেবে শিলিগুড়িতে ২ ঘন্টা সময় নষ্ট করে ফেলি। এটি করা যাবেনা, কেন তা বুঝিয়ে বলছি। মূলত শিলিগুড়ি থেকেই আপনাকে সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক যেতে হবে। শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক এর দূরত্ব ১১৫ কিলোমিটার, পৌছাতে সময় লাগবে মিনিমাম ৪-৫ ঘন্টা। জ্যাম থাকলে সময় বেশি লাগতে পারে।
সিকিম প্রবেশের আগেই রেঙ্কপো (Rangpo Check Post) নামের স্থানে আপনার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে সিল নিতে হবে। বলে রাখা ভালো সিকিমে প্রতিদিন কত মানুষ প্রবেশ করছে এবং কতমানুষ সিকিম থেকে বের হচ্ছে রেঙ্কপো চেকপোস্টে তার সকল তথ্যই জমা থাকে। এই চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে কোনভাবেই সিকিম প্রবেশ সম্ভব না। তবে রেঙ্কপো চেকপোস্টটি সন্ধ্যা ৮ টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। তাই যত দ্রুত সম্ভব শিলিগুড়ি থেকে রওয়ানা হওয়া উচিত।
আবহাওয়া খারাপ থাকায় এবং রাস্তা ধসে যাওয়ায় আমাদের রেঙ্কপো পৌছাতে রাত ৯টা বেজে যায়। চেকপোস্টের লোকজন বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত থাকায়, সৌভাগ্যবশত আমরা চেকপোস্টের কাজ তখনই শেষ করতে পেরেছিলাম। চেকপোস্টের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে না পারলে আপনাকে রাত্রে সেখানেই অবস্থান করতে হবে যেটা সত্যিই খুব কঠিন।
রেঙ্কপো চেকপোস্টে আপনার ৩০০×৩০০ সাইজের ছবি, পাসপোর্টের ও ভিসার ফটোকপি, এবং প্রযোজ্যক্ষেত্রে NOC (চাকুরিজীবী হলে) এর ফটোকপি লাগবে। এই চেকপোস্টে আপনাকে কোন প্রকার টাকা পরিশোধ করতে হবেনা।
শিলিগুড়িতে এজেন্সির প্যাকেজঃ
সিকিম ভ্রমণে আমরা শিলিগুড়ি থেকে এজেন্সির মাধ্যমে সকল কিছু বুকিং করেছিলাম। টোটাল ৫ রাত ৬ দিনের জন্য জনপ্রতি আমাদের যাওয়া-আসা, থাকা - খাওয়া, ঘুরাঘুরি বাবদ শিলিগুড়ি থেকে খরচ পড়েছিলো ৯০০০ রুপি করে। আমরা দেখেছি- সাঙ্গু লেক, নর্থ সিকিমের জিরো পয়েন্ট, ইয়ামথাম ভ্যালি, কাটাও এবং লোকাল সাইট সিয়িং এর ১০ টি পয়েন্ট। অর্থাৎ এজেন্সির মাধ্যমে সব কনফার্ম করে নিলে আপনি কোথায় থাকবেন- কোথায় ঘুরবেন সেগুলোর টেনশন করতে হবেনা। সব এজেন্সিই দেখবে।
এক্ষেত্রে নিজে নিজে সব করতে চাইলে হয়তো ২০০০ রুপি সেইভ করতে পারবেন। তবে গ্যাংটক পৌছানোর পর সাইট সিয়িং এর জন্য আপনাকে ঘুরে ফিরে এজেন্সির সাহায্যই নিতে হবে। আমার পরামর্শ হলো পরিবার নিয়ে গেলে শিলিগুড়ি থেকেই এজেন্সির সহায়তা নেওয়া।
উত্তম পরামর্শঃ
টাকা বাচাতে চাইলে শিলিগুড়ি পৌছে এসএনটি বাস টার্মিনাল হতে দ্রুত রওয়ানা দিয়ে দিন গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে। প্রতিদিন এসএনটি বাস টার্মিনাল থেকে সকাল সাড়ে ছয়টা, সোয়া ৭টা, ৯টা ও ১০টায় বাস ছেড়ে যায়। এরপর বেলা ১১টা, সাড়ে ১১টা, দুপুর সাড়ে ১২টা, ১টা, ২টা, আড়াইটা, এরপর ৩টা ও সাড়ে ৩টায় সিকিমের উদ্দেশ্যে বাস রওনা দেয়। শিলিগুড়ি থেকে সিকিমের গ্যাংটক পর্যন্ত মাথাপিছু ভাড়া ১৯০ টাকা। আপনারা চাইলে ১০ জনের শেয়ার গাড়িতেও যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৩০০ রুপি।
গ্যাংটক পৌছে আপনার কাজঃ
গ্যাংটক পৌছে আপনার প্রথম কাজ হচ্ছে থাকার জন্য রুম বুকিং করা। এবং শুধুমাত্র ঘুরাঘুরির জন্য এজেন্সি বুক করা। পরবর্তীতে আমাদের সকল সাইট সিয়িং এর আলোচনার পাশাপাশি বিস্তারিত প্লান শেয়ার করবো কোথায় কিভাবে ঘুরেছি, বরফের জন্য কোন সময়টা উত্তম, কত খরচ করেছি ইত্যাদি।
Happy Travelling!
তাছাড়াও যেকোন ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে কমেন্টস করুন।
________________________________________________________________________________________________________
লেখাটি ভালো লাগলে কমেন্ট করতে পারেন এবং এইরকম গোছানো নতুন নতুন ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে আমাদের YouTube চ্যানেল- Learning and Traveling ক্লিক করে Subscribe করতে পারেন। কোন পরামর্শ থাকলে কমেন্টে জানাতে পারেন। ধন্যবাদ সবাইকে।
লেখাটি ভালো লাগলে কমেন্ট করতে পারেন এবং এইরকম গোছানো নতুন নতুন ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে আমাদের YouTube চ্যানেল- Learning and Traveling ক্লিক করে Subscribe করতে পারেন। কোন পরামর্শ থাকলে কমেন্টে জানাতে পারেন। ধন্যবাদ সবাইকে।
No comments