গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গুলেক ভ্রমণ করুন অতি সহজে


লেখকঃ এডমিন, লার্নিং এন্ড ট্রাভেলিং গ্রুপ
তারিখঃ ২৪ নভেম্বর, ২০২৪

আসসালামু আলাইকুম। ডিয়ার ফ্রেন্ডস, আমরা আছি সিকিম পর্বের ২য় ব্লগে। আজক‍ে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো সবচেয়ে সহজ এবং অল্প টাকায় কিভাবে প্রায় সাড়ে বারো হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত বরফ বেষ্ঠিত ছাঙ্গু লেক ভ্রমণ করেছি। বরাবরের মতোই তথ্যবহুল এই ব্লগে আরও থাকবে কখন সাঙ্গুলেক ভ্রমণ করলে বরফ বা স্নোফল দেখতে পারবেন।

                                        ভিডিওঃ গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গুলেক ভ্রমণ- সিকিম সিরিজ

সিকিম ভ্রমণের ১ম পর্বে আলোচনা করেছি কিভাবে ঢাকা থেকে সহজে শিলিগুড়ি হয়ে গ্যাংটক পৌছা যায়, ইমিগ্রেশন প্রসেস, এজেন্সি সার্ভিস এবং মোট খরচের একটি সামারি। চাইলে নিচে দেওয়া লিংক থেকে সিকিম সিরিজের ১ম পর্ব দেখে আসতে পারেন। কথা দিচ্ছি নিঃসন্দেহে নতুন তথ্য পাবেন। পড়তে চাইলে এই লিংকে ঘুরে দেখতে পারেন- ঢাকা থেকে সিকিম ভ্রমণের যাবতীয় তথ্য

                                       ভিডিওঃ ঢাকা থেকে বুড়িমারী বর্ডার হয়ে গ্যাংটক, সিকিম

পাশাপাশি তথ্যবহুল এই ব্লগটি সম্পূর্ণ পড়ার অনুরোধ করছি! আলেঅচনা শেষে ভালো লাগলে এবং তথ্যবহুল মনে হলে শেয়ার করার জন্য বিনীত অনুরোধ থাকবে। তাহলে পড়তে থাকুন, সিকিম সিরিজের ২য় পর্ব। প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য কমেন্টস করতে পারেন।

মূল আলোচনাঃ

ছাঙ্গুলেক ভারতের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক লেক। উচ্চতা, বরফ কিংবা তুষারপাত এর কারণে প্রাকৃতিক এই লেকটি ভ্রমণ পিপাসু মানুষের কাছে সবচেয়ে পছন্দের। এই লেকটি Tsomgo হ্রদ নামেও পরিচিত। প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ফিট উপরে লেকের পানি নিয়ে রয়েছে নানান রহস্য, তাই স্থানীয়দের কাছে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ছাঙ্গুলেক একটি পবিত্র স্থান।

গ্যাংটক শহর থেকে দূরত্বঃ

গ্যাংটক শহর থেকে ছাঙ্গু লেকের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার যা ভারতের সিকিম রাজ্যের গ্যাংটক জেলার ছাঙ্গুতে অবস্থিত। দূরত্ব কম হলেও পাহাড়ি রাস্তা হওয়ায় বজরা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে ছাঙ্গু লেকে পৌছাতে সময় লাগে ১.৩০-২.০০ ঘন্টা।

ছাঙ্গুলেক ভ্রমণের উপায়ঃ

বাংলাদেশ থেকে যেতে হলে প্রথমে আপনাকে গ্যাংটক যেতে হবে। কিভাবে ঢাকা থেকে গ্যাংটক যাবেন, সেগুলো নিয়ে বিস্তারিত বলেছি সিকিম সিরিজের ১ম পর্বে। উপরের লিংক থেকে ১ম পর্ব দেখে পড়ে পারেন, চাইলে দেখেও আসতে পারেন। অতঃপর গ্যাংটক থেকে আপনাকে ছাঙ্গুলেক যেতে হবে।


সহজে গ্যাংটকের বজরা স্ট্যান্ড থেকে শেয়ার রিজার্ভ গাড়ি অথবা রিজার্ভ প্রাইভেট গাড়ি করে ছাঙ্গু লেক ঘুরতে যেতে পারেন। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আগের দিন বিকাল পাঁচটার মধ্যে অনুমতি নিয়ে রাখতে হবে। গাড়ির ড্রাইভার কিংবা এজেন্সির মাধ্যমে অনুমতি নিতে হবে।

তবে, সিকিম যেহেতু ভারতের সীমান্তবর্তী একটি প্রদেশ, তাই সেখানে সবকিছুই একটু কড়াকড়ি এবং জটিল। আগেই বলেছি বিদেশী পর্যটকদের ক্ষেত্রে গ্যাংটকের লোকাল সাইট ছাড়া সিকিমের অন্যান্য সকল স্থানেই বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে পরামর্শ হলো কোন এজেন্সি ছাড়া গেলে যে গাড়িতে ছাঙ্গু লেক যাবেন, সেই গাড়ির ড্রাইভারের সাথে অনুমতির বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা। গাড়ির ড্রাইভারই সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিবে।

সিকিমের দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখতে যে সকল প্রয়োজনীয় কাগজ লাগবে তার তালিকা নিচে দেখে নিন। প্রতিটির ৩-৪ কপি কাগজ সাথে রাখবেন।

১. আপনার ২ কপি পাসপোর্টসাইজ ছবি,
২. সিকিম প্রবেশের অনুমতি পত্র যা রেঙ্কপো চেকপোস্ট থেকে পেয়েছেন
৩. ইনার লাইন কপি (এজেন্সির কাছ থেকে পেয়ে যাবেন/ অথবা ড্রাইভারের কাছ থেকে নিতে হবে)
৪. পাসপোর্টের ফটোকপি
৫. ভিসার ফটোকপি

গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেকের ভাড়াঃ


গ্যাংটক থেকে সোমো শেয়ার কারে ছাঙ্গু লেকের ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৩০০-৪০০ রুপি। যেখানে ১০ জনের সাথে শেয়ার কারে ঘুরতে যেতে হবে। প্রাইভেটকার নিলে ভাড়া পড়বে ২৫০০-৩০০০ রুপি! ৩-৪ জন যেতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রাইভেটকারের পার্কিং খরচ, ড্রাইভারের দুপুর এর খাবার এবং অন্যান্য হিডেন চার্জ জেনে নিবেন। মনে রাখতে হবে গ্যাংটক থেকে ছাঙ্গু লেকে অনওয়ে কোন গাড়ি নেই, অর্থাৎ রিজার্ভকার ছাড়া আপনার কাছে অন্যকোন অনশন নেই।

ছাঙ্গু লেক ভ্রমণের উপযুক্ত সময়ঃ

ছাঙ্গুলেকে তুষারপাত কিংবা বরফ দেখার দুটো উত্তম সময় রয়েছে- বছরের শেষে এবং বছরের শুরুতে। অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বর থেকেই তুষারপাত ঘটার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্ত জানুয়ারি শুরু থেকে - ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তুষারপাত ঘটার সম্ভাবনা সবচেয়ে প্রবল। কখনো কখনো অতিরিক্ত তুষারপাতে রাস্তা বন্ধ যায়, ফলে ছাঙ্গুলেকে ভ্রমণ বন্ধ থাকে।

আপনাদের জন্য উত্তম পরামর্শ হলো মার্চের ১৫ এর পর ঘুরতে যাওয়া, তাহলে তুষারপাত না পেলেও রৌদ্রউজ্জ্বল আবহাওয়ার সাথে হাস্যেউজ্জ্বল বরফ পাবেন। মানে এক কথায় চমৎকার আবহাওয়া পাবেন। অতিরিক্ত শীতে ছাঙ্গুলেকে বরফ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবেননা। ডে লাইট না থাকলে ছবিও ভালো আসেনা। তাই পরামর্শ হলো আবহাওয়া বুঝে ঘুরতে যান।

প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতিঃ

প্রথমবার ছাঙ্গুলেক ভ্রমণে সবাই যে ভুল করে তা হলো, প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি না নেওয়া। মনে রাখতে হবে, আপনার বর্তমান আবহাওয়া যেমনই থাকুকনা কেন আপনি ১২,৩১৩ ফুট উপরে উঠতে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই সাথে ভারী শীতের কাপড় নিতে হবে, শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে পোর্টেবল অক্সিজেন মাস্ক, এবং কর্পুর সাথে রাখতে পারেন। পাশাপাশি সাথে শুকনো খাবার, চকলেট কিংবা পপকর্ন রাখতে পারেন। লেকের উপরে খাবার বলতে কেবল ম্যাগী নুডুলসই পাবেন।

আমরা শীতের কাপড় ছাড়াই রওয়ানা হয়েছিলাম, উপরে উঠার সাথে সাথেই শীতের তীব্রতা টের পেতে থাকি। পরক্ষণেই দ্বিগুণ মূল্যে কানটুপি, হাতমোজা এবং নেক বেল্ট কিনতে হয়েছিলো। শুধু তাই নয় তীব্র শীতের কারণে ২৫০ রুপি দিয়ে জ্যাকেট এবং ১৫০ রুপি দিয়ে বুটজুতো ভাড়া করতে হয়েছিলো। মনে রাখবেন, প্রতিটি গাড়ির ড্রাইভারের সাথে এসকল দোকানীদের একটা যোগসূত্র থাকে, তাই প্রয়োজনীয় পোশাক ভাড়া করার আগে যাচাই করে নিবেন। পরামর্শ হলো স্বল্পমূল্যে গ্যাংটকের লালচক থেকে কিনে নিয়ে যাওয়া।

ছাঙ্গুলেক রোপওয়ে বা ক্যাবলকারঃ

ছাঙ্গুলেকের অন্যতম আকর্ষণ হলো রোপওয়ে ভ্রমণ। যেখান থেকে আপনি পুরো ছাঙ্গুলেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। রোপওয়ে ব্যবহার করে আমরা প্রায় ১৫,৪০০ ফিট উচ্চতায় উঠেছিলাম। মাশাল্লাহ্ এতো উপর থেকে পাহাড় আর বরফের এমন সৌন্দর্য আগে কখনো দেখা হয়নি।


রোপওয়ের টিকেট জনপ্রতি ৩৬০ রুপি। তবে তিন বছরের ছোট বাচ্ছাদের টিকেটের প্রয়োজন হয়না। উপরে উঠেই আপনি ছাঙ্গু লেকের প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। মন জুড়িয়ে যাবে, যা কল্পনানীত। উপরে আপনারা চাইলে ১-১.৩০ ঘন্টা সময় ঘুরে দেখতে পারেন। রোপওয়ে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত চালু থাকে তবে অতিরিক্ত তুষারপাতে বন্ধ থাকে। ছাঙ্গুলেকের এই স্থানটি আপনাকে মুগ্ধ করবেই কেননা এখান থেকে একই সাথে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারবেন শুভ্র বরফ এবং দেখতে পারবেন মেঘের ছুটেচলা

ইয়াকি এক ধরণের প্রাণীঃ

ইয়াকি এক ধরণের প্রাণী যা মূলত দেখতে ষাড়ের মতো। ইয়াকিতে চড়ে ছবি তুলতে চাইলে আপনাকে দিতে হবে ১০০ রুপি। এবং ইয়াকিতে চড়ে পুরোলেক ঘুরতে চাইলে গুনতে হবে ৩০০-৪০০ রুপি। আলোচনা করে নিবেন।

যখন সিকিম যাওয়া রিস্কঃ

সিকিম যাওয়ার রাস্তা এবং সিকিম থেকে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার মূল রাস্তা পাহাড় ঘেষে হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে সেখানে বারবার পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। তাই জুনের মাঝ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সিকিম ভ্রমণে না যাওয়াই উত্তম। এই সময়টাতে ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য সিকিম ভ্রমণ অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ।

পরামর্শঃ

সিকিম সিরিজে গ্যাংটক পৌছে আমরা সর্বপ্রথম ছাঙ্গুলেক ভ্রমণ করেছিলাম এবং এটাই বেস্ট ডিসিশন ছিলো। তারপর ঘুরেছিলাম নর্থ সিকিম, কাটাও, জিরো পয়েন্ট, ইয়ামথাম ভ্যালী এবং সবার শেষে গ্যাংটক শহরের দর্শনীয় স্থান। 
আজকের পর্ব এখানেই শেষ করতে চাই। লেখাটি কেমন লাগলো মতামত জানাবেন । পরবর্তীতে আলোচনা করবো গ্যাংটক থেকে নর্থ সিকিম ভ্রমণের যাবতীয় খুটিনাটি।

ধন্যবাদ সবাইকে। ভালো থাকুন এবং সাবস্ক্রাইভ করতে ভুলবেননা। কথা হচ্ছে পরবর্তী আলোচনায়।

Happy Travelling!

তাছাড়াও যেকোন ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে কমেন্টস করুন।  
________________________________________________________________________________________________________
লেখাটি ভালো লাগলে কমেন্ট করতে পারেন এবং এইরকম গোছানো নতুন নতুন ভ্রমণ অভিজ্ঞতা পেতে চাইলে আমাদের YouTube চ্যানেল- 
Learning and Traveling ক্লিক করে Subscribe করতে পারেন। কোন পরামর্শ থাকলে কমেন্টে জানাতে পারেন। ধন্যবাদ সবাইকে।

No comments

Theme images by compassandcamera. Powered by Blogger.